যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ চুক্তিতে বাণিজ্য বিবাদ এড়ানো গেলেও অর্থনৈতিক শঙ্কা কাটেনি

ভোক্তাব্যয় বৃদ্ধি ও কোম্পানির মুনাফা চাপে পড়ার আশঙ্কা

সপ্তাহজুড়ে দর কষাকষির পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

সপ্তাহজুড়ে দর কষাকষির পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে পূর্ণমাত্রায় বাণিজ্য বিবাদ এড়ানো সম্ভব হলেও বেশ কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গিয়েছে এখনো। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপ থেকে পণ্য আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে। পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদেরই ব্যয় বাড়তে যাচ্ছে। আবার একই সঙ্গে বাড়তি এ শুল্ক ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি-রফতানি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মুনাফা মার্জিনকেও ব্যাপক মাত্রায় চাপে ফেলে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর রয়টার্স ও এপি।

এ চুক্তি নিয়ে নাখোশ ইইউভুক্ত দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতারাও। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরু চুক্তিটিকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ইউরোপের আত্মসমর্পণ’ হিসেবে। তার ভাষ্যমতে, চুক্তি সইয়ে দিনটি ইইউর জন্য এক অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন।

স্কটল্যান্ডের ট্রান্সবেরিতে ট্রাম্পের নিজস্ব গলফ রিসোর্টে রোববার ১ ঘণ্টার বৈঠকে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লায়েন। সেখানেই দুই নেতার আলোচনায় নতুন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা আসে। চুক্তি অনুযায়ী, ইইউ-ভুক্ত অধিকাংশ পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে এখন থেকে ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বসবে। চুক্তির আওতায় থাকা পণ্যের মধ্যে রয়েছে গাড়ি, কম্পিউটার চিপ, ওষুধসহ অধিকাংশ ভোগ্যপণ্য। তবে কিছু কৌশলগত পণ্য যেমন উড়োজাহাজ ও এর যন্ত্রাংশ, নির্দিষ্ট কৃষিপণ্য, জেনেরিক ওষুধ, সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রপাতি এবং কিছু কাঁচামালের ওপর দুই পক্ষই শুল্ক আরোপ থেকে বিরত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ইইউর ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক আগের মতোই বহাল থাকবে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক বাণিজ্য চুক্তি করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এর আগে যুক্তরাজ্য, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এবার ইইউর সঙ্গে বড় ধরনের একটি চুক্তিতে পৌঁছল যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ইউরোপের জন্য এটি এক রকম রাজনৈতিক সমঝোতা হলেও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঞ্চলিক জোটটির শিল্প সংগঠনগুলোও এ চুক্তি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। জার্মানির শিল্প খাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ফেডারেশন অব জার্মান ইন্ডাস্ট্রিজ এক বিবৃতিতে বলেছে, ১৫ শতাংশ শুল্ক ইউরোপের রফতানিনির্ভর শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এরই মধ্যে জার্মান গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফক্সওয়াগেন জানিয়েছে, শুধু শুল্ক বৃদ্ধির কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধে তাদের ১৩০ কোটি ইউরো ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে চুক্তির অংশ হিসেবে ইইউ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৫ হাজার কোটি ডলারের জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম কিনবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত ৬০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। অনেক বিষয়ে এখনো দরকষাকষি চলছে। যেমন স্পিরিটজাতীয় পণ্য বা নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের ওপর শুল্ক থাকবে কিনা সে বিষয়ে স্পষ্টতা পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি এখনো ‘রাজনৈতিক পর্যায়ের সমঝোতা’, যার পূর্ণাঙ্গ রূপ আসতে সময় লাগবে এবং চুক্তির নানা ব্যাখ্যা ও দ্ব্যর্থতা ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে এমন সম্ভাবনা রয়েছে।

চুক্তি ঘোষণার পর ইউরোপের শেয়ারবাজারে তাৎক্ষণিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। গতকাল প্যান-ইউরোপীয় স্টক্স ৬০০ সূচক ১ শতাংশ, জার্মানির ডিএএক্স সূচক দশমিক ৯ ও ফ্রান্সের কাক ৪০ সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যায়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকও দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রাখে।

তবে মুদ্রাবাজারে ইউরোর পতন ঘটে। ডলারের তুলনায় ইউরোর বিনিময় হার প্রায় দশমিক ৪ শতাংশ কমে যায়। বিনিয়োগকারীদের মতে, যদিও চুক্তি অনিশ্চয়তা কমিয়েছে, তবে ইউরোপীয় রফতানি খাতের প্রতিযোগিতায় চাপ বাড়াবে বলে ইউরোর মান দুর্বল হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, চুক্তির ফলে ইইউ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতিতে কিছুটা মন্থরতা আসবে। ইউরোপীয় কমিশন এরই মধ্যে ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ১ দশমিক ৩ থেকে কমিয়ে দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে চুক্তিটি ট্রাম্পের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হলেও অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপকে ছাড় দিতে হয়েছে। তবে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এ চুক্তি অনিশ্চয়তা কমিয়ে দিয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের স্বস্তির বার্তা। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে চুক্তির বিস্তারিত বাস্তবায়ন ও পরবর্তী বাণিজ্য আলোচনার গতিপথের ওপর।

আরও